২৫শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং | ১১ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:১৩

কুমারখালী রেলষ্টেশনে যাত্রীদের পানি পান করান শিপন

কুমারখালী স্টেশনে আসা ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হামিদুর রহমান শিপন। কুমারখালীর দূর্গাপুরের বাসিন্দা তিনি। এলাকায় তিনি ভিন্ন শিপন নামে পরিচিত।

 

কুমারখালী স্টেশনে যখন ট্রেন থামে বিশেষ করে বিকেলের দিকে তখন শিপন যাত্রীদের পিপাসা মেটানোর জন্য বালতি ও মগ নিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন। ‘পানি খান, ফ্রিতে পানি খান’ এমন ডাকে তখন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটির যাত্রীদের আকৃষ্ট করেন। যাত্রীদের পানি পানের জন্য মগ ভর্তি করে পানি দিতে থাকেন।
অনেকেই পানি পান করে টাকা দিতে চাইলেও শিপন তা কখনোই গ্রহণ করেননি।

 

এক যাত্রী বলেন, ‘কয়েকদিন আগে পরিবার পরিজন নিয়ে রাজবাড়ী থেকে পোড়াদহ ট্রেন করে যাচ্ছিলাম। এ সময় কুমারখালী স্টেশনে ট্রেন থামতেই ‘পানি খান, ফ্রিতে পানি খান’ এমন ডাকে আমি সহ আমার সঙ্গে থাকা কয়েকজন মিলে পানি পান করলাম। আমরা তখন বেশ তৃষ্ণার্ত ছিলাম। দুপুরে পানি পান করতে পেরে বেশ ভালোই লেগেছিল। পরে তাকে টাকা দিতে গেলে তিনি তা না নিয়ে ট্রেনের অন্য বগির দিকে চলে যান।’

 

শিপনের এমন উদ্যোগে এলাকাবাসীসহ ট্রেনের যাত্রীরা মুগ্ধ।
তবে শিপন পেশায় একজন হকার। তিনি কখনো বাসে, কখনো ট্রেনে চেপে আবার কখনো ফুটপাতে বসে গামছা, রুমাল, লুঙ্গি বিক্রি করে থাকেন। কুমারখালী রেলস্টেশন দিয়ে প্রতিদিন শত শত যাত্রী যাতায়াত করেন। মানুষের প্রতি বিশ্বাসের ওপর ভর করে তিনি স্টেশন সংলগ্ন একটি দোকান চালু করেন। দোকানটির নাম দিয়েছেন ‘ভিন্ন রকম দোকান’।

 

ব্যতিক্রমী এই দোকানটি পরিচালনার জন্য কোনো লোক নেই।
তবে দোকানভরা পণ্যের পসরা সাজানো রয়েছে। দোকানে ঢুকে ক্রেতারা পছন্দের পণ্যটি কিনবেন। প্রতিটি পণ্যের গায়ে দাম লেখা রয়েছে। দোকান থেকে পছন্দের পণ্য কিনে দাম পরিশোধ করার জন্য রয়েছে একটি বাক্স। সেই বাক্সেই ক্রেতারা ফেলেন টাকা। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এভাবেই প্রায় দুই বছর ধরে চলতে থাকলেও দোকানের জিনিসপত্র কোনো দিন চুরি হয়নি। কোনো দিন হিসাবেও টাকা কম পড়েনি বলে জানা গেছে।

 

ট্রেনের যাত্রী থেকে শুরু করে এলাকার সবার দৃষ্টি কাড়ে শিপনের এই অদ্ভুত দোকানটি। সংসার চালাতে একটু বাড়তি আয়ের উদ্দেশে এবং ‘অস্বাভাবিক’ এই ভাবনাটি বাস্তবে রূপ দিয়েছেন শিপন। আর এই বিশ্বাসের জাল বোনার ফলেই দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান আকিজ বেভারেজ গ্রুপের কোমল পানীয় ফ্রুটিকার বিজ্ঞাপনে স্থান পেয়েছিল ভিন্ন শিপনের বিশ্বাস, সততা আর ভালো মানুষের উদ্যোগের গল্প।

 

স্থানীয় সাংবাদিক দীপু মালিক বলেন, ‘১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মালামাল এই দোকানে খোলা থাকলেও কোনো দিন চুরি হয়নি। আমাদের সমাজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সেই সমাজে মানুষের প্রতি একজন হকারের যে বিশ্বাস তাতে আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত। এছাড়া শিপন যেভাবে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের পানি পান করান তাতে তাকে আমরা স্যালুট করি। সত্যি তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।’

 

এ ব্যাপারে শিপন বলেন, ‘আমি ফুটপাতে রুমাল, গামছা বিক্রি করে থাকি। বাড়তি আয়ের জন্য স্টেশন সংলগ্ন একটি দোকান দিয়েছি। কিন্তু দোকানে বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দৈনিক সংসার চালানোর খরচ শুধু দোকান থেকে ওঠে না। তাই দোকান খুলে রেখে আমি ফুটপাতে ঘুরে ঘুরে গামছা, রুমাল বিক্রি করি। ক্রেতারা দোকানে এসে জিনিস পছন্দ হলে সেটা দামের তালিকা দেখে টাকা বাক্সে রেখে চলে যান।’

 

খোলা দোকানে চুরি হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে শিপন বলেন, ‘আমি মানুষকে বিশ্বাস করি, আর এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই দোকান করেছি। রাতে এসে টাকা নিয়ে দোকান বন্ধ করি এবং সকালে এসে খুলে মাল রেখে চলে যাই। প্রায় দুই বছর ধরে এভাবেই দোকান চলছে। দৈনিক ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকার জিনিস বিক্রি হয়। আর সেখান থেকে আমার আয় হয় ২শ থেকে ৩শ টাকা। এর পাশাপাশি হকারি করে আর যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে ছেলে মেয়ের লেখাপড়াসহ সংসারটা ভালোই চলে যাচ্ছে।’

 

স্টেশনে ট্রেনের যাত্রীদের ফ্রিতে পানি খাওয়ানোর ব্যাপারে শিপন বলেন, ‘আমি একজন মানুষ। তাই মানুষ হিসেবে মানুষের সেবা করাই আমার কাজ। গরমের সময় অনেকেই ট্রেনের মধ্যে তৃষ্ণার্ত থাকে। তারা একটু ঠান্ডা পানি পেলে তাদের পিপাসা মেটাতে পারে। তাই এমন ভাবনা থেকেই আমি এ কাজটি করি।‘

 

দোকানের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি বিক্রেতাবিহীন দোকান করেছি। কারণ আমি মানুষকে বিশ্বাস করি। মানুষকে বিশ্বাস না করলে ভালো কিছু করা যাবে না। এতে করে মানুষের বিশ্বাস ও সততা বেড়ে যাবে বলে আমি মনে করি।’

 

বর্তমানে শিপনের বড় মেয়ে সুমাইয়া নবম শ্রেণিতে এবং ছেলে জিম চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে।