১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সকাল ৭:০২

বাবা জন্মদিনের কেক এনে দেখেন ছেলে নেই

‘বাবা, আমার জন্মদিনে নতুন জামা কিনে দিবা না? আর কেকটা যেন বড় হয়। জন্মদিনে নানি-মামারা আসবে না? কাকে কাকে দাওয়াত দিবা? আমার বন্ধুদের সবাইকে আসতে বলব কিন্তু। বেশি করে বেলুন কিনে আনবা…।’

নিজের জন্মদিন ঘিরে এক সপ্তাহ আগে থেকেই শিশু মুহিন ইসলাম বারবার এসব কথা বাবা-মাকে বলছিল। মুহিনের বায়নার কোনো কমতি ছিল না।

ছোট্ট মুহিন ইসলাম ৮ বছর শেষ করেছেন। শনিবার (৩ আগস্ট) ছিল তার ৯ম জন্মদিন। বিশেষ এই দিনটি ঘিরে শিশু মুহিনের প্রস্তুতি গ্রহণের শেষ ছিল না। যে বন্ধুদের দাওয়াতও করেছিল। আত্মীয়-স্বজনদেরও আসার প্রস্তুতি ছিল। বাবা তার ছেলে মুহিনের বায়না মতো বড় কেক কিনে আনেন। কিন্তু সেই কেক আর কাটা হলো না মুহিনের।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের প্রামাণিকপাড়া গ্রামে হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে।

জানা গেছে, মুহিন জগদীশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা ময়নুল ইসলাম পেশায় কৃষক। মা মণি বেগম গৃহিণী। দুই ছেলের মধ্যে মুহিন ইসলাম বড়।

প্রিয় সন্তানের চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে জন্মদিন পালনের জন্য বাবা-মায়েরও ছিল জমকালো প্রস্তুতি। জন্মদিনের একদিন আগেই আত্মীয়-স্বজন সবাইকে দাওয়াত দেয়া হয়ে গেছে। জন্মদিন পালনের বাজার করা হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। তাই বিকাল থেকে স্বজন ও মুহিনের বন্ধুদের পদচারণায় বাড়ি ভরপুর।

বাবা ময়নুল ছেলের চাওয়া মতো নতুন জামা কিনে এনেছেন। সব কিছু দেখে মুহিনের সে যে কী আনন্দ! চারদিকে ছোটাছুটি! আর মুহিনের মা ব্যস্ত রান্নাবান্না ও আত্মীয়-স্বজনদের সামলাতে।

মুহিনের চাহিদা অনুয়ায়ী পাশের দোকান থেকে বড় কেক নিয়ে এসেছেন বাবা। ‘হ্যাপি বার্থডে মুহিন’ লিখা কেকটি দেখে মুহিন খুবই খুশি হয়। সন্ধ্যা ৭টার পর কেক কাটার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। কিন্তু মুহিন নেই!

এরপর এ-ঘর ও-ঘর সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করা হয়। কিন্তু কোথাও নেই মুহিন। তখন চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে ‘ছেলেধরা’ মুহিনকে ধরে নিয়ে গেছে। এসময় একজন প্রতিবেশী এসে জানান, সন্ধ্যায় তিনি মুহিনকে বাড়ির পাশে থাকা গভীর গর্তের দিকে যেতে দেখেছেন।

এ কথা শুনে মুহিনের বাবা-মায়ের চিৎকার। বাবা-মাসহ বাড়ি ভরা অতিথিদের সবাই ছুটলেন সেই গর্তের দিকে। গলাপানির ওই গর্তে নেমে খুঁজে পাওয়া যায় মুহিনকে। মুহিনের নড়াচড়া নেই। দেহ নিথর।

পরে তাকে দ্রুত সেখান থেকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মা মণি বেগম ছেলে মুহিনকে চিরকালের মতো হারিয়ে বিলাপ করছেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমার মুহিন কোথায়? ও তো খায়নি। ডাকো। তাড়াতাড়ি কেকটা কাটো।’

স্থানীয়রা জানান, ময়নুলের বাড়ি থেকে ১০০ গজের মধ্যে স্থানীয় কৃষক বাচ্চু মিয়ার আবাদী জমি। এই জমির দুই শতকের মাটি খুঁড়ে ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ কারণে সেখানে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষায় ওই গর্তে পানি জমেছে অনেক।

প্রতিবেশীদের ধারণা, গর্তের কাছ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পা ফসকে মুহিন পড়ে ডুবে যায়। এতেই তার মৃত্যু হয়।

রবিবার মুহিনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।