১৯শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ১০:৩৯

পানি থাকা সত্বেও কুলুখ নেয়া অথবা কুলুখ নেয়ার পর পূনরায় পানি নেয়া ইস্তিঞ্জা করা ইসলামের বিধান কি?

নিউজ ডেস্কঃ  পানি থাকা সত্বেও কুলুখ নেয়া অথবা কুলুখ নেয়ার
পর পূনরায় পানি নেয়া ইসলামের বিধান কি?
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। অগণিত দুরূদ ও সালাম নাযিল হউক প্রিয় নবী মুস্তফা আহাম্মদে মুজতবা সায়্যিদুল আম্বিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি। শান্তি বর্ষিত হউক আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরাম রেজুয়ানাল্লাহি তা’আলা আজমাঈন গণের উপর।

আমাদের সমাজে, রাস্তাঘাটে, মাদ্রসায়, মসজিদে ও বিভিন্ন জায়গায় হরহামেশা দেখা যায় প্রায় মানুষই প্রস্রাবের পর ঢিলা-কুলূখ ধরে দাড়িয়ে থাকে। শুধু দাড়িয়েই থাকেনা; লজ্জাস্থানে ধরে রেখে বেহায়া, নির্লজ্জের মত হাটাহাটি করে, জোরে জোরে কাশি দেয়, উঠবস করে, পায়ে পায়ে কাঁচি দেয়। অথচ সে সময় অনেক লোক তাদের সামনে দিয়ে চলাফেরা করে। মসজিদের টয়লেটের অবস্থাতো আরও করুন। জিজ্ঞেস করলে আরও উল্টা ধমক!!! কিছু আলেম মানে হুজুরেরা এই বেহায়ায়ি কর্মটির ব্যাপারে এমন কিছু ফযিলতের কথা বয়াণ করে যাতে আমাদের সমাজের মানুষ বিশেষ করে মুরুব্বিগণ এই কাজটি করতে আরও উদ্ভুদ্ধ হন। পক্ষান্তরে আলেম সমাজের উচিৎ ছিল এই জঘন্য কাজটি হতে জনসাধারণকে সতর্ক করা। জাল, যঈফ হাদীসের আলোকে ফযিলত বয়াণ না করে কুর’আন- সহীহ হাদীস দ্বারা ঢিলা-কুলূখ এর ব্যবহার সম্পর্কে মুসলিমদের শরীয়ত শিক্ষা দেয়া। যাই হোক, তাই এ সম্পর্কে আজ মোটামোটি একটি ধারনা দেয়ার চেষ্ঠা করব ইনশাআল্লাহ।
মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “রাসূল (সাঃ) তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহন কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহ্‌ কে ভয় কর। নিশ্চই আল্লাহ্‌ কঠোর শাস্তিদাতা। (সূরা হাশর:৭)

পানি থাকা অবস্থায় কুলুখ নেওয়া শরী‘আত সম্মত নয়। পানি না পাওয়া গেলে কুলুখ নেওয়া যাবে। তবে পুনরায় পানি ব্যবহার করতে হবে না। কুলুখ নেওয়ার পর পানি নেওয়া সম্পর্কে যে হাদীছ বর্ণনা করা হয় তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
.
→ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নিম্নোক্ত আয়াত কুবাবাসীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ‘এতে এমন কতিপয় লোক রয়েছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্র হওয়াকে ভালবাসে। আর আল্লাহ উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন কারীকে ভালবাসেন’ (তওবা ১০৮)।
অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলেছিল, (আমরা ইস্তিঞ্জাকরার সময়) ঢিল নেওয়ার পর পানি নিই।
.
#তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি জাল বা মিথ্যা। এই বর্ণনার কোন ভিত্তি পাওয়া যায় না।
ইমাম বাযযার এটি বর্ণনা করে বলেন, ‘যুহরী থেকে
মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আযীয ছাড়া অন্য কেউ একে বর্ণনা করেছেন বলে আমার জানা নেই। আর সে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছে।
ইবনু হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিঃ) বলেন,
.মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল আযীযকে আবু হাতেম যঈফ বলেছেন। তিনি আরো বলেন, তার ও তার দুই ভাই ইমরান ও আব্দুল্লাহ কারো একটি হাদীছও সঠিক নয়। তাছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনু শাবীবও দুর্বল।
.
★উক্ত বর্ণনার বিরোধী ছহীহ হাদীছ : উক্ত হাদীছ যে জাল তার বাস্তব প্রমাণ হল নিম্নের ছহীহ হাদীছ, যেখানে ঢিলের কথাই নেই।
.→আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এই আয়াতটি কুবাবাসীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ‘এতে এমন কতিপয় লোক রয়েছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্র হওয়াকে ভালবাসে’ (তওবা:১০৮)। তিনি বলেন, তারা পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করত।
অন্য হাদীছে এসেছে,
.→আবু আইয়ূব আনছারী, জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ ও আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয়- ‘তথায় (কুবায়) এমন কতিপয় লোক
রয়েছে, যারা পবিত্রতা লাভ করাকে ভালবাসে এবং আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন’ তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, হে আনছারগণ! এই আয়াত
দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের পবিত্রতার প্রশংসা করেছেন। তোমরা কিভাবে পবিত্রতা অর্জন কর? তারা বলল, আমরা ছালাতের জন্য ওযূ করে থাকি, অপবিত্রতা হতে গোসল করে থাকি এবং পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করে থাকি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এটাই তার কারণ। সুতরাং তোমরা সর্বদা এটা করতে থাকবে।[5] #মূল কথা হল, অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীরা শুধু ঢিল
দ্বারা ইস্তিঞ্জা করত। কিন্তু কুবাবাসীরা অন্যদের তুলনায় শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করতেন। সে জন্যই আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন।
.
★আরেকটি জাল হাদীছ :
→˝আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের স্বামীদেরকে বলে দাও, তারা যেন পেশাব-পায়খানার সময় ঢিল নেওয়ার পর পানি ব্যবহার করে। আমি তাদেরকে বলতে লজ্জাবোধ করছি। কারণ রাসূল (ছাঃ) এটা করেন˝।
.
#তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি জাল। এ শব্দে কোন বর্ণনা নেই। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, এর কোন ভিত্তি নেই।
উক্ত বর্ণনার বিরোধী সরাসরি ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। যেখানে কুলুখ নেওয়ার কথা নেই; বরং শুধু পানি নেওয়ার কথা রয়েছে। যেমন-
.
→আয়েশা (রাঃ) বলেন, তোমরা তোমাদের স্বামীদের বলে দাও, তারা যেন পানি দ্বারা পবিত্রতা হাছিল করে। কারণ আমি তাদেরকে বলতে লজ্জাবোধ করছি। নিশ্চয়ই
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তা করে থাকেন।[8] .অতএব সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উক্ত মিথ্যা প্রথাকে অবশ্যই উচ্ছেদ করতে হবে। পানি থাকা সত্ত্বেও যেন কোন স্থানে কুলুখের স্তূপ সৃষ্টি না হয়। কারণ প্রকৃত ফযীলত পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করার মধ্যেই রয়েছে।

★ কুলুখ নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা :
.কুলুখ নিয়ে চল্লিশ কদম হাঁটা, কাশি দেওয়া, নাচানাচি করা, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, টয়লেটে কুলুখের আবর্জনার স্তূপ তৈরি করা সবই নব্য মূর্খতা। ইসলামে এরূপ বেহায়াপনার কোন স্থান নেই। মিথ্যা ফযীলতের
ধোঁকা মানুষকে এত নীচে নামিয়েছে।

#উল্লেখ্য যে, পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের পেশাবে
অপবিত্রতার মাত্রা বেশী।
অথচ তাদের ব্যাপারে এ ধরনের চরম ফতোয়া দেয়া হয় না। অনুরূপভাবে একই ব্যক্তি যখন টয়লেট থেকে বের হয় তখন কিন্তু হাঁটাহাঁটি করে না, কুলুখও ধরে না। এগুলো তামাশা মাত্র। এই অভ্যাস ইসলামের বিশ্বজনীন
মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ইসলাম সৌন্দর্য মন্ডিত জীবন বিধান। যাবতীয় নোংরামী এখানে নিষিদ্ধ। শরী‘আতে পেশাব থেকে সাবধানতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। তাই বলে এর নামে নতুন আরেকটি বিদ‘আত তৈরি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পেশাবের
ছিটা কাপড়ে লেগে যাওয়ার আশংকায় ইসলাম তার জন্য সুন্দর বিধান দিয়েছে। আর তা হল, ওযূ করার পর হাতে পানি নিয়ে লজ্জাস্থান বরাবর ছিটিয়ে দেওয়া। যেমন-

. →‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন পেশাব করতেন, তখন ওযূ করতেন এবং পানি ছিটিয়ে দিতেন’।

অতএব প্রচলিত বেহায়াপনার আশ্রয় নেওয়ার কোন
প্রয়োজন নেই। নারী-পুরুষ সকলকে এ ব্যাপারে সাবধান ও সতর্ক থাকতে হবে।
আল্লাহ্‌ আমাদের সকলকে বুঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.